Hello Testing Bangla Kobita

প্রতি মাসে দ্বিতীয় রবিবার

Advertisement

2nd Year | 4th Issue

বুধবার, ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | Wednesday, 6th October, 2021

ভি ন দে শে । পর্ব ৮

সম্প্রতি ‘ইতিকথা পাবলিকেশন’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কবি ঈশিতা ভাদুড়ীর একটি অসাধারণ দু’ ফর্মার ভ্রমণ বিষয়ক গদ্যগ্রন্থ ‘ভিনদেশে’। একাধিক বিদেশ ভ্রমণের টুকরো অভিজ্ঞতার  কিছু অংশ তিনি তুলে ধরেছেন সেখানে। এখানে প্রতি পর্বে  আমরা জানব তাঁর তেমনই আরও কিছু দারুণ অভিজ্ঞতার কথা।

ঈ শি তা  ভা দু ড়ী

মাইন নদীর ধারে | ২য় পর্ব

যাই হোক, আমরা মিউজিয়াম দেখছিলাম– Deutsches Filmmuseum — ফিল্ম সংক্রান্ত ক্যামেরা তথ্যাদি রয়েছে। এটি আর্কিটেকচার মিউজিয়াম। মাঝে একটি কফির দোকান দু’টি মিউজিয়ামকে সংযুক্ত করেছে। একটি বাড়ির মধ্যে বাড়ি, তার মধ্যে বাড়ি, সবটুকু একটি বড় কাচের ব্লকে মোড়া, এটি নাকি খুবই ঝঞ্ঝাটপূর্ণ প্রোজেক্ট ছিল। নিউ ইয়র্কের স্থপতি Oswald Mathias Ungers তৈরি করেছিলেন। কিছু দূরে জার্মান পোস্টাল মিউজিয়ামটিও বেশ ভাল দেখতে, এটি কয়েক বছর হলো তৈরি হয়েছে। পরবর্তী মিউজিয়াম Stadel — খুঁটিয়ে দেখতে গেলে সারাদিন লেগে যায়। ইতালীয় ফ্রা আঞ্জেলিকো থেকে পলক্লি অবধি ৬০০ বছরের আর্ট সামগ্রী রয়েছে। এছাড়া পঁচিশ হাজার ড্রয়িং এবং পঁয়ষট্টি হাজার প্রিন্ট রয়েছে। স্ট্যাডেল আর্ট ইনস্টিটিউট ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমান বাড়িটি অবশ্য ১৮৭৪ থেকে ১৮৭৮—এই কয় বছর ধরে তৈরি করেছেন অস্কার সমার। এই ইনস্টিটিউটের একভাগে স্টেট কলেজ অফ আর্ট। স্ট্যাডেলে গ্যালারিতে উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর বহু সংগ্রহ রয়েছে।

Eiserner Steg—মাইন নদীর ওপর এটি একটি ইস্পাত-ব্রিজ, মধ্য-ঊনবিংশ শতাব্দীতে চালু হয়েছিল। তখন এই ব্রিজে চলাচল করা যেত শুল্কের বিনিময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিজটি ভূমিসাৎ হয় এবং নতুন করে তৈরি করা হয় মূল ব্রিজটির অনুকরণে। এই ব্রিজটি মানুষের পায়ে হাঁটার জন্য। রাস্তা থেকে সিঁড়ি দিয়ে ব্রিজের লেভেলে যেতে হয়। সিঁড়ি ছাড়া লিফটও আছে। কটাই বা সিঁড়ি। কিন্তু আমরা লিফটে করেই উঠলাম। বিদেশে এক-একটি লিফট এক-একরকম। উঠে কোন সুইচে হাত দেব বুঝতে না পেরে সােমা এমন একটি বোতামে হাত দিল যার জবাবে একটি মহিলা কণ্ঠ জার্মান ভাষায় কীসব বলতে লাগল মাথা-মুন্ডু কিছুই বুঝলাম না। তবে এইটুকু বুঝলাম, বিপদে পড়লেই ওই বোতাম চালু করতে হয়। শেষাবধি অবশ্য অন্য বোতামের সাহায্যে ব্রিজের ওপরে এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচি!

ওই ব্রিজে যাওয়ার আগে Dreikonigskirche চার্চ, নদীর দিকে মুখ করে। এর চুড়োটি ৮০ মিটার লম্বা। ফ্রাঙ্কফুর্টে প্রথম বৃহত্তর নিও-গথিক চার্চ, Franz Josef von Denzinger তৈরি করেছিলেন। পাশেই নিও-ক্লাসিক্যাল ফোয়ারা। এই চার্চের কিছু দূরেই Deutschordenshans—তৎকালীন যোদ্ধাদের প্রতিষ্ঠান। Daniel Kayser নকশা করেছিলেন, ১৭০৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭১৫ খ্রিস্টাব্দ এই ছয় বছর ধরে তৈরি করা হয়েছিল, ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে বোমা বর্ষণে ধ্বংস হয়েছিল। কিছু অদল বদল করে নতুন করে তৈরি করা হয়েছিল প্রায় তিন বছর ধরে, ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি। পাশেই সেন্ট মেরি চার্চ। এখান থেকে আমরা বেড়াতে বেড়াতে কিছু না বুঝেই মদ্য তৈরির জায়গায় চলে গিয়েছিলাম —অনেকখানি চত্বর জুড়ে একটি বিশাল বাড়ি, সুবিশাল মিনার, লিফটে করে ওপরে যাওয়া যায়, সেখানে ২টি রিভল্ভিং রেস্টুরেন্ট আছে, সন্ধের পর খোলে। লিফটে যেতে গেলে যথেষ্ট দক্ষিণা দিতে হয়। অতএব যাঁরা পারেন তাঁরা ৭৩১টি সিঁড়ি হেঁটে উঠতে পারেন। ১২০ মিটার উঁচু থেকে ফ্রাঙ্কফুর্টকে খুবই সুন্দরভাবে উপভোগ করা যায়। ওপরে একটি মিউজিয়ামও আছে, সেখানে বিভিন্ন রকম মদ্য সংরক্ষিত রয়েছে।

Screenshot_20210129-121602

যাই হােক, ওই Eisemer Steg ব্রিজে হেঁটে, আমরা Remerberg-এ পৌঁছে গেলাম। এই অঞ্চল অল্প উঁচুতে। আগেকার দিনের শহরবাসীরা অবশ্য হিল(hill) বলত। এই অঞ্চলটি পাঁচ রাস্তার একটি চত্বর। ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রথম রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলি এখানে হয়। আগে বিরাট চত্বর ছিল, বাড়ি-ঘর ছিল না। ধীরে ধীরে এই চত্বরটিকে উন্নত করা হয়েছে। মধ্যিখানের ফোয়ারাটি ১৫৪১-১৫৪৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হয়। দ্রুত এই চত্বরটি শহরের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠল। এই অঞ্চলটির প্রায় সর্বাংশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংস হয় এবং বর্তমান Romerberg পুনরায় তৈরি হয়। এই চত্বরেই Romer টাউন হল। বর্তমানে Dom ক্যাথিড্রালের মিনার যেখানে, সেখানেই মূল টাউন হলটি ছিল। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়। তাছাড়া বড় অনুষ্ঠানের পক্ষে জায়গাটি ছোট হওয়ায় ১৪০৫ খ্রিস্টাব্দে নতুন বাড়ি কেনা হয়। পরবর্তী ৪০০ বছরে টাউন হল বিস্তৃত হয়, আরও নয়টি বাড়ি সংযুক্ত হয়। এই চত্বরটিতেই ত্রয়াদোশ শতাব্দীর গথিক স্থাপত্যের সেন্ট নিকোলাস চার্চ ১২৯০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হয় এবং মাঝিমাল্লাদের উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়। আগে মিনারের ওপরে প্রহরী থাকত হর্ন বাজিয়ে বড় জাহাজকে স্বাগত জানাবার জন্য। এখন বন্দুকধারী নিরাপত্তা বাহিনী নজর রাখে সেখান থেকে যখন কোনও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হয়। চার্চের পেছনে হিস্টরিকাল মিউজিয়াম। যেভাবেই হোক ভেতরের সংগ্রহাদি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের প্রকোপ থেকে রেহাই পেয়েছিল এবং ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে মিউজিয়ামটি ফ্রাঙ্কফুর্টের ঐতিহাসিক স্মারকই নয় শুধু, পরিবর্তনশীল আধুনিক তথ্যকেন্দ্রও। এখানে গ্রাফিক ছবি, স্লাইড এবং আরও উন্নতমানের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে ইতিহাসকে বিস্তৃতভাবে হাতের নাগালে পাওয়া যায়।

এই Romerberg অঞ্চলেই Schirn আর্ট গ্যালারি—নানারকম প্রদর্শনী, নাটক, কনসার্ট ইত্যাদি হয়। একদিকে Struwwelpeter মিউজিয়াম—ডঃ হেরিক হফম্যানের মূল পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে। ডঃ হফম্যান ফ্রাঙ্কফার্টের মানুষ ছিলেন। ১৮০৯ থেকে ১৮৯৪ অবধি জীবিত ছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আজও তার সৃষ্টি মানুষের কাছে আদরণীয়। জীবিতকালে তিনি ডাক্তার ছিলেন পেশায়। তিনি বিশ্ববিখ্যাত লেখকও বটে—শিশুদের জন্য তার লেখা, ছবি খুবই বিখ্যাত। মিউজিয়ামে যা প্রদর্শিত ছিল, লেখাগুলি জার্মান ভাষায়, ইংরেজিতে অনূদিত কিছু পাওয়া যায়নি, অতএব বােঝার তাে উপায় নেই, ছবিগুলি দেখে সুকুমার রায়ের কথাই য়ামার মনে পড়লো। আমার জ্ঞান খুবই কম, ডঃ হফম্যানের লেখাকে জানার সৌভাগ্য হয়নি আমার, কিন্তু এটুকু অনুভব করতে পারলাম যে সুকুমার রায়ের লেখা এবং তাঁর লেখার মধ্যে কোথাও একটা ভীষণ মিল রয়েছে। ডাঃ হফম্যান তার সব পাণ্ডুলিপি, স্কেচ এই মিউজিয়ামে দিয়েছেন। এছাড়া ডাঃ হফম্যানের ফ্রাঙ্কফুর্টের শহরবাসী হিসেবে এবং বিভিন্ন বিষয়ে ভূমিকা বিরাট, বিশেষত ডাক্তারি ক্রিয়াকর্ম, মনোরোগবিদ্যায় সংস্কারকের ভূমিকা,  এবং ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে গণতন্ত্রবাদী হিসেবেও তার ভূমিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

এই মিউজিয়ামের সামনেই Dom ক্যাথিড্রাল, বেলেপাথর দিয়ে তৈরি, নবম শতাব্দীর চার্চ, ১২৩৮ খ্রিস্টাব্দে পুনপ্রতিষ্ঠিত করা হয়। ১৩৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ক্যাথিড্রাল হিসেবে আখ্যা পায়, ১৫৬২ থেকে এই ক্যাথিড্রাল রাজার অভিষেকের জন্য ব্যবহার করা শুরু হয়। গথিক স্থাপত্যের মিনারটি এত বিরাট যে আমার ক্যামেরায় তাকে আনতে খুবই বেগ পেতে হয়েছে, ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়ে ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে শেষ হয়েছে। এই ক্যাথিড্রালটির চুড়োয় ওঠা যায়, তার জন্য অবশ্য ৩৮৩টি সিঁড়ি ভাঙতে হয়, এবং যথেষ্ট দক্ষিণাও দিতে হয়। এই দুটির শেষটি যদিও বা সম্ভব, প্রথমটি তো আমাদের পক্ষে বেশি অসুবিধাজনক ছিল। এই ক্যাথিড্রালের সঙ্গে একটি মিউজিয়ামও রয়েছে।

মাইন নদীর উত্তর ধারের মূল ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরটি। সেদিকেই Paulsplatz-এ সেন্ট পলসের চার্চ—যেটি ফ্রাঙ্কফুর্টের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ১৭২১ খ্রিস্টাব্দে সেন্ট ফ্রান্সিসের অনুগামীরা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। লাইব্রেরি এবং স্কুল হিসেবে ব্যবহার করা হত। ঘটনাচক্রে এই চার্চটি প্রোটেস্টান্টদের প্রধান প্রার্থনার মন্দির হয়ে উঠেছিল। ধর্ম-নিরপেক্ষ ইতিহাসই এর খ্যাতির কারণ। এই চার্চটি জার্মানদের মধ্যে স্বাধীনতার এবং একতার প্রতীক। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জে এফ কেনেডি স্বয়ং এখানে এসে ভাষণ দিয়েছেন। ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ব বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশনা সংস্থার বার্ষিক পুরস্কার বিতরণ সভা এখানেই হয়। গ্যেটে (Gothe) পুরস্কার থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণ হয় সাহিত্য সমাজ-বিজ্ঞান দর্শন ইত্যাদির জন্য, এছাড়া বিশ্ব শান্তির জন্য, ক্যান্সার গবেষণার জন্যও এখানে পুরস্কার বিতরণ হয়।

সেন্ট্রাল, রেল স্টেশনের কাছেই বিখ্যাত কবি গ্যেটে (Gothe) র স্ট্যাচু, আমরা অবশ্য সারা শহর ঘুরে এখানে এসে পৌঁছেছিলাম। কেউই আর বলতে পারে না, আমি যথেষ্ট বিরক্ত ওদের না বলতে পারায়। সোমা অবশ্য খুবই সহানুভূতিশীল, সে আমাকে বোঝানো চেষ্টা করল—আরে, কলকাতার কয়জন নেতাজির স্ট্যাচু বা গান্ধীজির স্ট্যাচুর হদিশ দিতে পারে! হাঁটতে-হাঁটতে গ্যেটের বাড়িতে পৌঁছে গেলাম এখানে ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে জন্মেছিলেন। ১৯৪৪-এর বোমায় এটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ভেতরে গ্যেটের পরিবারের জিনিসপত্র রয়েছে। সংলগ্ন মিউজিয়ামে প্রচুর তথ্য ও ছবি আছে। লাইব্রেরিতে এক লক্ষেরও বেশি বই এবং বহু পাণ্ডুলিপি রয়েছে।

দ্বিতীয় কি তৃতীয় দিনে ফের Zeil, তার একদিকে Hauptwache আগে শহরের মূল কারাগার হিসেবে ব্যবহার হত। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে এটি কফি খাওয়ার দোকান হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়, তারপর ধীরে-ধীরে রেস্টুরেন্টে পরিণত হয়। েখন এখানে খুব ভিড় হয় বিকেলে কফি খাওয়ার জন্য। এই বাড়িটির পেছনে নিও ক্লাসিকাল ফোয়ারা, রেনেসাঁ আমলের একটি কুয়োর বদলে এটি তৈরি হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীতে। এই চত্বরের দক্ষিণ দিকে কোণাকুণিভাবে সেন্ট ক্যাথারিনের চার্চ, যেখানে গ্যেটে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হন। ১৯৪৪-এ চার্চটি ধ্বংস করা হয় এবং দশ বছর ধরে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এখানে ধর্মীয় গান-বাজনা হয়।

IMG_20210129_123259

আরও পড়ুন...